এতে চলতি ২০২৫-২৬ অর্থবছরের দ্বিতীয় প্রান্তিকের (অক্টোবর-ডিসেম্বর ২৫) তথ্য বিশ্লেষণে দেখা গেছে, দেশের সামগ্রিক অর্থনীতি শূন্য দশমিক ৫ স্কোর নিয়ে মাঝামাঝি অবস্থানে থাকলেও ম্যানুফ্যাকচারিং বা উৎপাদন খাত অত্যন্ত নাজুক পরিস্থিতির মধ্য দিয়ে যাচ্ছে। এতে আরো বলা হয়েছে, কৃষি খাত দশমিক ৮ স্কোর নিয়ে ‘খুব উচ্চ’ প্রবৃদ্ধি ও শক্তিশালী অবস্থান অর্জন করেছে। অন্যদিকে, সেবা খাতের দশমিক ৪৭ স্কোর নিয়ে ‘মাঝারি’ উন্নতি দেখা গেছে। তবে উৎপাদন খাত দশমিক ৩৩ স্কোর নিয়ে সবচেয়ে ‘নিম্ন’ অবস্থানে রয়েছে, যা দেশের শিল্প খাতের দুর্বল অগ্রগতির প্রতিফলন।
রাজধানীর ডিসিসিআই মিলনায়তনে গতকাল ‘অর্থনৈতিক অবস্থান সূচক (ইপিআই): ঢাকার সামষ্টিক অর্থনীতির ত্রৈমাসিক মূল্যায়ন’ শীর্ষক এক সেমিনারে মূল প্রবন্ধ উপস্থাপনায় এসব তথ্য উঠে আসে। চলতি অর্থবছরের প্রথম ও দ্বিতীয় প্রান্তিকের তথ্য বিশ্লেষণ করে এ গবেষণা পরিচালনা করা হয়েছে। এতে উৎপাদন ও সেবা খাতের ৭৬২ জন প্রতিনিধির মতামত নেয়া হয়।
অনুষ্ঠানে স্বাগত বক্তব্য রাখেন ঢাকা চেম্বারের সভাপতি তাসকীন আহমেদ। তিনি বলেন, ‘দেশের প্রচলিত সামষ্টিক অর্থনৈতিক সূচক ও পরিমাপক ব্যবস্থাগুলো স্বল্পমেয়াদে অর্থনীতির প্রকৃত অবস্থা বা তাৎক্ষণিক পরিবর্তনগুলো তুলে ধরতে পারছে না। ফলে সংকট মোকাবেলায় কার্যকর পদক্ষেপ নেয়া কঠিন হয়ে পড়ছে।’ এ প্রেক্ষাপটে ঢাকা চেম্বার প্রণীত ‘অর্থনৈতিক অবস্থান সূচক (ইপিআই)’ একটি অত্যন্ত সময়োপযোগী উদ্যোগ, যা নীতিনির্ধারক ও উদ্যোক্তাদের বাস্তব অবস্থার নিরিখে কার্যকর সিদ্ধান্ত নিতে বড় ভূমিকা রাখবে বলে মনে করেন ডিসিসিআই সভাপতি।
সেমিনারে মূল প্রবন্ধ উপস্থাপন করেন ডিসিসিআইয়ের ভারপ্রাপ্ত মহাসচিব একেএম আসাদুজ্জামান পাটোয়ারী। তিনি জানান, জলবায়ু পরিবর্তনের প্রভাবে কৃষি খাতে খাদ্যপণ্য উৎপাদন কমছে, জ্বালানি সংকটে শিল্প খাতের উৎপাদন স্থবির হয়ে পড়েছে। রেকর্ড মূল্যস্ফীতির কারণে মানুষের ক্রয়ক্ষমতা কমে যাওয়ায় সেবা খাতের অগ্রগতিও বাধাগ্রস্ত হচ্ছে। এ পরিস্থিতি থেকে উত্তরণের জন্য কৃষকদের স্বার্থ সুরক্ষায় বাজারমূল্য স্থিতিশীল করা, এসএমই উদ্যোক্তাদের সহজ শর্তে ঋণ দেয়া, শিল্পে নিরবচ্ছিন্ন জ্বালানি সরবরাহ, ভ্যাট হ্রাস এবং বন্দরগুলোর পণ্য খালাস প্রক্রিয়া দ্রুত করার সুপারিশ করেন ডিসিসিআইয়ের ভারপ্রাপ্ত মহাসচিব।
সেমিনারে অর্থনীতিবিদ ও পলিসি রিসার্চ ইনস্টিটিউটের চেয়ারম্যান ড. জায়েদী সাত্তার বলেন, ‘এ ধরনের অর্থনৈতিক সূচকের জন্য হাই-ফ্রিকোয়েন্সি বা উচ্চ কম্পাঙ্কের তথ্য অত্যন্ত প্রয়োজন। মাসিক বা ত্রৈমাসিক ভিত্তিতে নিয়মিত তথ্য প্রকাশ করা হলে তা ব্যবসার প্রকৃত অবস্থা বুঝতে সহায়ক হয়।’ গবেষণাটি বর্তমানে ঢাকাকেন্দ্রিক হলেও এর গ্রহণযোগ্যতা বাড়াতে দেশব্যাপী এটি পরিচালনা করা প্রয়োজন, যা উদ্যোক্তাদের ব্যবসা পরিচালনার পরিবেশ বুঝতে সাহায্য করবে বলেও জানান তিনি।
সাপোর্ট টু সাসটেইনেবল প্রজেক্টের আন্তর্জাতিক বাণিজ্য বিশেষজ্ঞ নেসার আহমেদ বলেন, ‘এলডিসি উত্তরণের পর ইউরোপীয় বাজারে শুল্কমুক্ত সুবিধা হারালে সবচেয়ে বেশি ক্ষতিগ্রস্ত হবে এসএমই খাত। তাই ব্যবসা পরিচালনা ব্যয় কমানো এবং ব্যবসাবান্ধব নীতিসহায়তা নিশ্চিত করা জরুরি।’
নির্ধারিত আলোচনায় আরো অংশ নেন বাণিজ্য মন্ত্রণালয়ের অতিরিক্ত সচিব শিবির বিচিত্র বড়ুয়া; পররাষ্ট্র মন্ত্রণালয়ের মহাপরিচালক (ইন্টারন্যাশনাল ট্রেড, ইনভেস্টমেন্ট অ্যান্ড টেকনোলজি উইং) ড. সৈয়দ মুনতাসির মামুন; বাংলাদেশ ব্যাংকের প্রধান অর্থনীতিবিদ অধ্যাপক ড. আখন্দ মোহাম্মদ আখতার হোসেন; বাংলাদেশ বিনিয়োগ উন্নয়ন কর্তৃপক্ষের (বিডা) যুগ্ম সচিব মো. আরিফুল হক; ঢাকা বিশ্ববিদ্যালয়ের অ্যাকাউন্টিং বিভাগের অধ্যাপক ড. মিজানুর রহমান ও অর্থনীতি বিভাগের অধ্যাপক ড. এম নিয়াজ আসাদুল্লাহ এবং ইন্টারন্যাশনাল ফাইন্যান্স করপোরেশনের (আইএফসি) সিনিয়র প্রাইভেট সেক্টর স্পেশালিস্ট মিয়া রহমত আলী।